আমাদের আধুনিক ডিজিটাল জগতের যে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা সেই ব্যবস্থাপনায় মূলত ছোটদের ভাবনাকে ভেঙে ফেলার , গড়তে না দেওয়ার এবং কল্পনা করতে না দেওয়ার একটা অপরিসীম চেষ্টা চলেছে। তবু এইরকম বিপরীত অবস্থায় দাঁড়িয়ে গল্প দিদা নিজের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের পরিবার গুলিতে এখন কিন্তু বাচ্চাদের সে অর্থে গল্প বলার কেউ নেই। সঙ্গ দেবার কেউ নেই বিভিন্ন কর্মশালার মধ্যে দিয়ে সুদেষ্ণা মৈত্র অর্থাৎ গল্প দিদা নামে পরিচিত এই মানুষটি এই কাজটি নিরন্তর করে যাচ্ছেন।
মালবিকা- গল্পদিদা সুদেষ্ণা মৈত্র আমি জানতে চাইছি তোমার ছোটবেলার জীবনে কিভাবে গল্প তোমাকে তৈরি করেছে।
গল্পদিদা- ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতে একটা নিয়ম ছিল যে বাবা আমাদের সবাইকে বসিয়ে গল্প শোনাতেন। এছাড়াও আমাদের এক জ্যাঠতুতো দাদা খুব ভালো গল্প বলে শোনাতেন । জ্যাঠতুতো দিদিরাও কোথাও হয়তো সিনেমা দেখে এলেন সেখান থেকে আমাদের গল্প বলে শোনাতেন আর আমরা কোলে বসে শুনতাম সেখানে প্রেমের জায়গা বাদ দিয়ে সে গল্প আমাদের বলে যেত।
সুতরাং ছোট থেকেই আমরা গল্প শোনা গল্প বলা এরকম পরিবেশেই বড় হয়ে উঠেছি এ ছাড়া আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে বই গোছাতে ভালোবাসতাম, আমাদের স্কুলের লাইব্রেরীতে যেতে ভালোবাসতাম। খুব একটা গল্পের বই পড়তাম না তবে যে গুটিগতক পড়তাম সেটা যদি খুব ভালো লাগতো তাহলে সেটাই একাধিক বার পড়ে ফেলতাম। যেমন কিছু রূপকথার গল্প, 'পথের পাঁচালী'র কিছু অংশ আর বাবার কারণে ছোটবেলায় 'মহেশ'পড়ে আমার একটা অদ্ভূত অনুভূতি হয়েছিল । পরবর্তীতে গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে যখন এই গল্পটাই পাঠ্য হয়, তাদের পড়াতে গিয়ে সেই একই অনুভূতি, একটা যন্ত্রণার অনুভূতি আমার গলার কাছে আটকে থাকতো। মেয়েরাও কেঁদে ফেলত।
এছাড়াও ছোটবেলায় আমি খুব ভুগতাম। আমরা ছোটবেলায় ভুগলে, বড়োদের কাছে কিছু পয়সা কড়ি পাওয়া পেতাম।
ছোটবেলা থেকেই আমি পড়াতে ভালোবাসতাম। আমার বাবার ড্রাইভারের ছেলে অথবা আমার মায়ের কাজের মাসির সন্তান যেই হোক না কেন তাদের আমি পড়াতাম। মা ব্যাপারটা খুব একটা পছন্দ করতেন না তার কারণ আমার নিজের পড়া তখন হতো না। এছাড়াও আমার কাকা দেবীপ্রসাদ নিয়োগী, তিনি আজীবন সিপিআই করতেন তার আমাকে অত্যন্ত স্নেহ এবং আমাকে কিছু একটা অন্যরকম কিছু ভাবা অদ্ভূত বিষয় ছিল হয়তো।তিনি বেঁচে থাকলে আমাকে হয়তো প্রত্যক্ষ রাজনীতিতেই নিয়ে আসতেন। আমার বাবারা ছোটবেলায় বড় হয়েছেন বা ছোটবেলা কেটেছে কোচবিহারে । সেখানে আমার কাকা তখন মাত্র ৭ বছর বয়স তিনি একটি কাঁঠাল গাছে উঠে কাঁঠাল পাড়তে গিয়ে তার বাঁ হাতটা ভেঙে গিয়েছিল যেটা তিনি তার মাকে তিন দিন পর্যন্ত জানাননি। তারপর যখন পচা গন্ধ বেরোলো হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সেই হাত কনুই থেকে কেটে দিতে হলো কিন্তু সেই একহাতেই তিনি একটা সময় অনেক কিছু সামলেছেন । বিশেষত সিপিআই পার্টি এছাড়াও সেই বাড়িতে আসতেন অনেকে, সেই সময় সিপিআই এর নেতারা আলোচনা , সভা সমিতিতে বক্তৃতা দিতে, পরিকল্পনা করতে আসতেন। । আমার এই কাকার প্রেরণায় পাশের বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণি । একটি স্কুল খুলি আমার বাড়ির ছাদে। সেখানে আমার কুকুর এসে রণে ভঙ্গ দিত । খুব স্বাভাবিক বাচ্চারা তো ভয় পাবেই। ছ'মাস সেই স্কুলটা ছিল। বলা চলে সেখানেই প্রথম আমার হাতে লেখা বই আমি ওদের জন্য নিজের হাতে বই লিখতাম। নিজের হাতে ছবি এঁকে স্বরবর্ণ গুলি চেনানোর চেষ্টা করতাম। পাড়ার এক বয়স্ক ভদ্রলোক ওদের জন্য স্লেট দিয়েছিলেন। বাচ্চারাও সে সময় নিয়মিতই আসত।
মালবিকা- তারমানে তোমার সেটা সত্যি সত্যিই পড়ানো ছিল পড়া পড়া খেলা ছিল না। আমাদের যেমন ছোটবেলায় ছিল পড়া পড়া খেলা ।হাতে যা পাচ্ছি তাই ধরেই প্রায় পেটাচ্ছি। নানান কিছু শেখাচ্ছি এমনকি রবি ঠাকুরের ছেলেবেলার যে গল্প আমরা জানি সেখানেও আমার সেটাই দেখেছি।
সুদেষ্ণা দি- না আমি পেটাতাম না এমনকি পুতুলের বিয়ে যখন দিচ্ছি বই ভালোবাসার কারণে নিজের হাতেই কাগজ কেটে বই তৈরি করে তাকে ভালো করে মলাট দিয়ে সাজিয়ে সেই বই বউয়ের বাড়িতে উপহার যেত এইসব হতো আর কি।
মালবিকা- তবে হ্যাঁ এটাও ঠিক আমি তোমার এই পড়ানো প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ল যে ছোটবেলায় দুজনকে আমি সত্যিই খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম । তাদের ছবিও দিয়েছিলাম একবার ফেসবুকে । একজন বাড়িতে কাজ করত, আরেকজন ধারে কাছে বস্তিতেই থাকত। একটু ভুল হলেই পিঠে দিতাম গুমগুম করে । ( দুজনেই হাসি) তাদের জীবনের পরিণতি একটি সময় পর খুব খারাপ হয়েছিল । সেটা আমি এখন এখানে বলতে চাই না। আর সেসব আমার নিয়ন্ত্রণেও ছিল না।
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ এটা তো ঠিকই যে আমাদের ছোটবেলায় গভর্মেন্ট থেকে এমন কোন বাধ্যতা ছিল না যে সকলকে স্কুলে যেতে হবে।
মালবিকা- হ্যাঁ তাছাড়া সভ্য দেশের যেটা নিয়ম হওয়া উচিত সেটা সম্ভবত বিনামূল্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, বিনা পয়সায় লেখাপড়া সকলের জন্য প্রয়োজনীয় ও আবশ্যক । সেটি হলেই একটি দেশকে সভ্য স্বাধীন বলা যায়।সেটি আমাদের দেশে এখনো নেই বলেই জানি।
এছাড়াও আজ বঙ্গদর্শন অনলাইন পত্রিকায় তোমার একটা লেখা পড়ছিলাম সুদেষ্ণা দি, যে, বাচ্চার হাতে মোবাইল দিয়ে বাবা-মা নিশ্চিন্তে কাজ করছেন নিজেদের। এই অনাবশ্যক বিষয়টি আবশ্যক হয়ে গেছে সর্বক্ষেত্রে । তুমি তো জানোই যে আমি প্রতিদিনের মেট্রো পথের যাত্রী ফলতঃ এই দৃশ্যটা আমি সবসময়ই দেখি। একটা দিন কেবল দেখেছিলাম একজন বাবা তার বাচ্চার হাতেও মোবাইল নেই তার নিজের হাতেও মোবাইল নেই। তিনি বাচ্চাকে ছড়া বলে বলে নিয়ে যাচ্ছেন ,গল্প করছেন বা কোন একটা অংক বলছেন । এই একটা দিনই অন্যরকম কিছু দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
তারপর ধরো এখন আরো চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে এআই হয়ে যাওয়ায় । ভাবনা-চিন্তা গুলোকে আরো বেশি করে হত্যা করবার প্রবণতা জেগেছে। এটা খুবই চিন্তার ব্যাপার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে যারা এখন লেখাপড়া করছে।
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ, আর ভাষাটাই যখন সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ হয়ে যায় অর্থাৎ বাংলা ভাষা যখন সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ তখন বাচ্চাদের লিখিয়ে দেওয়া, বলে দেওয়া, তাদের ভাবতে না দেওয়া এটা বিভিন্ন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার ক্ষেত্রে ঘটে যাচ্ছে এটা সত্যি খুবই চিন্তার বিষয়।
মালবিকা- হ্যাঁ, আর ভাষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাতেই তো এর ভিতটা গড়ে ওঠে সেখানে যদি ভাবনা-চিন্তার জায়গাটাকে না গড়তে দিয়ে যদি প্রথমেই পরনির্ভরশীল করে দেওয়া হয় , তাহলে মুশকিল।। আচ্ছা ফিরে আসি প্রশ্নে।এই রকম বয়সে তুমি কীভাবে নিজের লেখার জায়গাটা জোরদার করলে?
সুদেষ্ণা দি- এরকম বয়সে বলতে প্রাথমিক স্তরে কি করেছি সেটা মোটামুটি বলেইছি গল্প শোনা ইত্যাদি। তবে ক্লাস এইট নাইনে থাকাকালীন আমি ডাইরি লিখতাম। আমার কুকুরটাকে নিয়ে বেড়াতে বের হতাম বিকেলবেলা, তখন তো এতো গাড়ি ঘোড়ার ব্যাপারও ছিল না ।সুন্দর গোলপার্ক ঘুরে আবার ফিরে চলে আসতাম। আমি আমার কুকুরের সঙ্গেই প্রচুর গল্প করতে করতে যেতাম। এখন গল্প লেখার সময় বুঝতে পারি যে একটা বাচ্চা তো তার একটা পুতুলের সঙ্গে একটা কোন পোশাক জীবজন্তুর সঙ্গে বা গাছের সঙ্গে কথা তো বলবেই। তারপর বই সাজানো আমার পছন্দের বিষয় সেখানে যে বইটা আমার পছন্দের তার সাথে বকবক করতাম।
মালবিকা- কিন্তু এখন, এইসব বকবক গুলোকে কি অনেক সময় হয়তোবা desorder বলা হয়ে থাকে জানি না। হ্যাঁ এরপর বলো।
সুদেষ্ণা দি- এবার আমি কলেজে গেলাম । পড়াশুনা ভালো করবো না ভেবেই পাসেই ভর্তি হলাম। এদিকে বাংলা প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় আমি নাম দিলাম ব্রেবর্ণে এবং আমাদের কলেজ শিবনাথ শাস্ত্রী কে রিপ্রেজেন্ট করলাম। ঘটনাচক্রে প্রথম স্থান অধিকার করলাম। এই ব্যাপারটা দেখে আমাদের এক মাস্টারমশাই দিব্য নারায়ণ ভট্টাচার্য বললেন, "তুমি অনার্স নিয়ে নাও"। আমার তো মাথায় হাত। দিদিদের দেখেছি সাংঘাতিক পড়তে হয়।
সেরকম একটি পর্যায়ে আমার জীবনে এলেন আর এক মাস্টারমশাই, তিনি নকশাল নেতা ছিলেন , সাউথ সিটিতে ও পড়াতেন। আমার জীবনকে যদি কেউ পাল্টে দেয় মানসিকভাবে তিনি হলেন অরিজিৎ মিত্র। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি গোল্ড মেডেলিস্ট এছাড়াও আমাদের শিবনাথ শাস্ত্রী কলেজেও তিনি পড়াতেন তার কারণে আমার সম্পূর্ণ একটা মানসিক পরিবর্তন এলো। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন হয় তার থেকে আমার মন মানসিকতা বেরিয়ে এলো সামগ্রিকভাবে। তাঁর ঋণ আমার জীবনে অনস্বীকার্য।
মালবিকা- নকশাল পর্ব বলতেই একটা অদ্ভূত অজানা উত্তেজনা রক্তের মধ্যে হয় টের পাই এবং ক্রমে মনে হচ্ছে তোমার জীবনের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পর্বেও বোধহয় একটা পরিবর্তন আসছে সেটার দিকে তাহলে ক্রমে এগোই । সেটা নিশ্চয়ই অন্য একটি গল্প।
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ ক্রমে শুভাশিস মৈত্র এলেন। তার সঙ্গে আমার আলাপ হল আমারই এক দিদির বাড়িতে। দিদির ভাসুর পো আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন তারই বন্ধু শুভাশিস মৈত্র। সেখানে দেখলাম দাড়িওয়ালা ছ' ফুটের মতন লম্বা একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে মাঝে মধ্যেই আমার ছবি তুলছে । আমি অতো গুরুত্ব দিইনি। শুনলাম তিনি নাকি ভালো লেখেন। দিদির ভাসুরপো বাবু দাদা শুভাশিস এরা মোটামুটি ইন্টালেকচুয়াল গ্যাং সেসময়ের। তো তাদের দলেই ভিড়ে গেলাম । প্রথম দেখলাম গোদারের সিনেমা। এমনকি ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা যাদবপুরে যখন ঋত্বিক ঘটক ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে এই সমস্ত দেখা আমার ওদেরই সঙ্গে। শুভাশিস মৈত্রর তখন আজকালে লেখা বেরিয়েছে । সে কাঁধে একটা ঝোলা নেয় , সবাই প্রশংসা করে তার লেখার। আমি প্রশংসা করতে গেলে উনি বলেন যে তাঁর এসব প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে না । যাইহোক এবারে গোদারের সিনেমা দেখতে বসেছি ডান পাশে একটা মানুষ ওরকম বসে আছেন আমার তো কেবলই সংশয় একদিকে সামনে গোদারের সিনেমা আর পাশে একজন ইন্টালেকচুয়াল মানুষ । সুতরাং আমি বেশ একটা অসুবিধা জনক অবস্থায় পড়েছি। আমি একেবারে সিঁটিয়ে রইলাম। দেখার পর বিস্তর আলোচনা। আর ভেতরে চলতে থাকল বাড়ি ফেরার তাড়া।
মালবিকা- ( হাসি) বেশ এরকম তালে গোলে তোমাদের প্রেম হয়ে গেল, বুঝতে পারছি বেশ সিনেমাটিক ব্যাপার।
সুদেষ্ণা দি- শুভাশিস তখন শনিবারের চিঠিতে কাজ করে। আমাদের একটা সাদামাটা বিয়ে হল কারণ শুভাশিস শুধু একটা পায়জামা পাঞ্জাবি পরে এসেছে বিয়ে করতে সেসব দেখে আমার মা তো প্রায় অজ্ঞান।
মালবিকা- ঠিক যেমন শিব ঠাকুরের বাঘছাল খুলে পড়ে যাওয়ায় মেনকা অজ্ঞান হবার দশা(হাসি)।!
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ নামটাও শুভাশিস ।
মালবিকা- হ্যাঁ ঐশ্বরিক। সত্যি জীবনের গল্প এত আছে তোমার যে বই পড়ে আলাদা করে আর গল্প বের করার অনেক সময়ই প্রয়োজন হয় না বলো?
সুদেষ্ণা দি- বিয়ে করে নতুন ফ্ল্যাটে এসে পাঁপড়ের ঝোল রেঁধে দিলেন বিশ্বজিৎ।সে খাদ্য আমাকে আশ্চর্য করেছিল।
মালবিকা- তখন এতো দেখনদারি ছিল না। মানুষে মানুষে আত্মার বন্ধন গুরুত্ব পেত।
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ আমার মাস্টারমশাই এবং আমার বর এদের জীবনের যে দর্শন সে সবকিছু কিছু আমি পছন্দ করেছিলাম বলেই এরকম সাদামাটা সোজা সহজ ভাবে জীবন কাটাতে পেরেছি। ওঁদের দর্শনবোধেই আমি গা ভাসিয়েছি।
মালবিকা- এই দর্শন ভাবনার কথাতেই ফিরে আসি বঙ্গদর্শনেই তোমার লেখায় পড়লাম যে মায়েরা সন্তানের খুব ভালো বন্ধু হয়। এটা আমি একটুখানি হয়তো কন্ট্রাডিক্ট করছি হয়তো তুমি অন্য কিছু ভেবে এই কথাটা বলেছ সেটা যদি একটু বল। কারণ বাবাদের ও তো একই দায় থাকে সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠার।
সুদেষ্ণা দি- হ্যাঁ বলেছি এই কারণে আমাদের সমাজে বাবারা অর্থাৎ আমাদের পুরুষ সন্তান যেভাবে বড় হয়ে ওঠে সেখানে সত্যি তাদের এই দায় পালন করতে হয় না । পরবর্তী লেখায় আমি অবশ্যই এই বিষয়ের আরো অনেকটাই বলবো যেখানে বাবারাও দায়বদ্ধ । কারণ আমার জীবনে আমার বাবা আমার সন্তান দের জীবনে তাদের বাবা ভালো বন্ধু। সমাজের চোখে একটি মেয়ে যখন রোজগার করে সেটা এমন কোন ব্যাপার নয় বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেটা কোন এমন বড় কাজের বিষয় নয় , কষ্টের বিষয় নয় । কিন্তু ছেলের রোজগার করাটা বেশ কষ্টের। এই জায়গাগুলো থেকেই আসলে এটা বলার। ফলতঃ দায় টা চেপে বসে একটি মায়ের উপরেই।
এবার এই প্রসঙ্গ টেনে আমার নিজের ছোটবেলার একটা কথা বলি তখন আমরা ওই শাড়ি পরে বউ বউ খেলতাম বা ওড়না মাথায় দিয়ে বউ বউ খেলতাম। সেসব দেখে বাবা বলেছিলেন ' আমি চাই তুমি আশাপূর্ণা দেবীর মতন লেখক হও'। সত্যি কথা বলতে কি তখনও আমি লেখক হব বাচ্চাদের গল্প লিখব কোনদিন ভাবিনি। তবে শিক্ষয়িত্রী হব এই বাসনা আমার মনের মধ্যে ছিল।
মালবিকা- হ্যাঁ অথচ তুমি ছোটদের জন্য বই লিখছো বা ছবি এঁকে দিচ্ছ রাস্কিন বন্ডের ক্ষেত্রেও দেখেছি তিনি নিজেই বলছেন যে লিখতে বসে মনে হচ্ছে কি লিখব। না লিখে তিনি লিখে দিচ্ছেন হয়তো এভাবেই তাঁর লেখা এগিয়েছে। সহজ স্বাভাবিক সাবলীল ভাবে । আমার ছেলের কাছে শুনি যে তোমার লেখা খুব সহজ সরল ওটা পড়ে ফেলতে খুব ভালো লাগে। এইরকম ভাবেই লিখতে হবে । হঠাৎ একদিন ও বলে ফেলল।
যেমন তোমার লেখা 'লজেন্সের দেশে' আর 'বিনতির গল্প'। না আমি অবশ্যই তোমার সঙ্গে রাস্কিন বন্ডের বা রাস্কিন বন্ডের সঙ্গে তোমার তুলনা করছি না। তুমি একদম আলাদা কল্পনার জগতের একটা জায়গা থেকে বাস্তবিক কি হতে পারে সেই কথা বলো আর রাস্কিন বন্ডের ব্যাপারটা হচ্ছে তার একেবারে ছোটবেলায় থাকা এ দেশে দীর্ঘ সময় ধরে, সে অভিজ্ঞতাগুলি আমাদের সামনে গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরে আমাদের ভাবান। তোমার দর্শনগত ভাবনাগত জগৎ আলাদা ওনার দর্শনগত ভাবনাগত জগৎ আলাদা।
আমার জানতে ইচ্ছে করে তুমি এত লিখছো কি করে আর প্রতি শুক্রবার তুমি এত গল্প বলে যাচ্ছ সেই লকডাউনের সময় থেকে আমার যতদূর মনে পড়ছে। সেটা কি করে সম্ভব?
সুদেষ্ণা দি- এই কথাটা বলতে হলে আমাকে চলে যেতে হবে আমার পড়ানোর দিনগুলিতে । যখন আমি গোখলেতে বা বিদ্যাভারতী তে পড়াচ্ছি। 'কর্ণ কুন্তী সংবাদ ' তখন পড়াতে হতো বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাই হোক না কেন আমি চলে যেতাম ঠাকুরবাড়ির কোন গল্পে সেখান থেকে চলে আসতেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যাকরণ পড়াতে গিয়ে ওদের চরিত্রে ভাগ করে দিচ্ছি বিভিন্ন পদে ভাগ করে দিচ্ছি আর এটা আমার অদ্ভুত নেশার মতন হয়ে গিয়েছিল। এর জন্য একেবারেই আমার পড়ানো বা আমার বিদ্যালয়ের দিনগুলি দায়ী।
এছাড়াও 'মেঘনাদবধ কাব্যের' ষষ্ঠ সর্গ পড়াতে হতো তখন আমার মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রথম সর্গ মুখস্থ ছিল। আমি সেটা বলতাম। এইভাবেই ওদের মনটাকে টেনে আনার কাজ করতাম।
এছাড়াও শুনেছি যে প্রাচীনকালে কোন এক মুণি তার ছাত্রদের পাঠ দিচ্ছিলেন ব্যাকরণের । তো সেই সময় শিক্ষক ছাত্রের মাঝখান দিয়ে চলে গিয়েছিল হাতি। প্রথা ছিল মাঝখান দিয়ে হাতি চলে গেলে এক বছরের মধ্যে কোনরকম পাঠ দেওয়া যাবে না । তখন সেই মুণি স্থির করলেন ছন্দে ছন্দে গল্পের মধ্যে দিয়ে সেই ব্যাকরণ তিনি শেখাবেন ।একবছর সে পাঠ বন্ধ থাকবে না। এরকম ঘটনা ইংরেজি সাহিত্যেও নাকি আছে । সেটা আমার জানা ছিল না। না জেনেই আমি এইরকম একটি পদ্ধতি শুরু করেছিলাম। এবং এই বিষয়ে আমার একটি বই ও প্রকাশ পাবে।
ক্লাসে পড়ানোর সময় আমি মেয়েদের ট্রেন হতে বলতাম। সেই ট্রেনেই যুক্ত হতো বিভিন্ন পদ। সম্বন্ধ পদ , সম্বোধন পথ অনেক পরে এসে জুড়ত। মাঝখানে জুড়ে যেত কোথাও অনুসর্গ বিসর্গ এইভাবে ওদের পরপর সে সব পদ হয়ে খেলাতাম।তারা থামত বাক্য নামে একটি স্টেশনে।এইটা নিয়ে আমার ছাত্রীরা কোন একটা বছরে ভালো নাটক করেছিল।
আমার মনে হয় গল্পের মতন ভালো মাধ্যম পড়ানোর জন্য আর কিছু নেই । এই যেমন তোরা গান গাস , কোন গানটার পর কোন গানটা গাইবি সেটা সাজানো থাকে। অর্থাৎ একটা গল্পেরই রেখা এঁকে চলতে হয়।একটা ছবি এঁকে দেওয়ার চেষ্টা থাকে। নাচের মাধ্যমেও এমন ছবি আঁকা যায়। গল্পে সেই ছবিটা আঁকা যায় বলেই তোর ছেলে আমাকে ছোটবেলায় জিজ্ঞাসা করেছিল দুয়োরানী সুয়োরাণী হয় তাহলে দুয়ো রাজার শুয়ো রাজা হয় না কেন?
মালবিকা- হ্যাঁ ঠিক।মনে হয় অবন ঠাকুরের 'ক্ষীরের পুতুল 'এর প্রভাব।
সুদেষ্ণা দি- সেটাই আমার চিন্তা হয় যে আদৌ কি আমরা ওদের সেই জগৎটা ধরতে পারছি? কারণ ওদের ভাবনার কল্পনার জগৎটা কিন্তু বিরাট। ছোটবেলাতেই এটা সম্ভব , ওদের ভাবনার যে বিশাল আকাশ সেখানে কিছু যদি গেঁথে দেওয়া যায়। কারন আমাদের প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থার শ্রুতির কথা ভুললে চলবে না। আমরা শুনে শুনে মনে রাখতাম। সেখানেই আমাদের ছবি আঁকা হতো।
মালবিকা- হ্যাঁ সেই আমলে আমাদের ব্রেনটাই 2GB মেমরি রাখতে পারতো।
সুদেষ্ণা দি- গল্প পড়ে এবং গল্প শুনে আমাদের মস্তিষ্ক যেভাবে ধারণ করতে পারে সেটা আধুনিক আর কোন কিছুর মাধ্যমেই সম্ভব নয় বলে আমি বিশ্বাস করি। খুব সমস্যায় পড়ি যখন দেখি যে ওদের উনুন কথাটা বোঝাতে পারছি না ।বা হারিকেন বোঝাতে পারছি না। যে কারণে কুমোরটুলিতে অর্ডার দিয়ে আমাকে ছোট আকৃতির এই সমস্ত মাটির বাসন বা উনুন বানাতে দিতে হয়েছে।
মালবিকা- এ প্রসঙ্গে একটু জিজ্ঞাসা করি যে কেবল শহরের বাচ্চাদের নিয়ে তুমি কাজ করো না ।বিভিন্ন গ্রাম মফস্বলেও তুমি যাও সেখানে তাদের পারস্পরিক আচরণের কোন পার্থক্য কি লক্ষ্য কর?
সুদেষ্ণা দি- নির্ভয়ে বলছি শহর গ্রাম মফস্বল বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আমি অন্তত কোন তফাৎ খুঁজে পাই না কারণ চোখ কথা বলে। শিশুমনে চোখের যে দীপ্তি সেটা একই থাকে। পুরনো গল্পকে নতুন আঙ্গিকে বললে অর্থাৎ কচ্ছপ ও খরগোশের গল্পটার শেষটাকে আমি বদলে দিয়েছি। সকলেরই জানা । প্রথমদিকে শুনতে শুনতে সকলেই বলে যে জানি তারপর আমি যখন অন্য একটা কিছু বলি মিলনান্তক একটা পরিণতি ঘটাই, ওরা খুব আনন্দ পায়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার সেটা হলো শব্দ চয়ন। আমার প্রথম বই "সহজ পড়া" বইতে আমি সেই অনুশীলনটাই করেছি। শিশু মন কখন কিসে আঘাত পায় এটা ব্যাপারে আমরা খুব একটা সচেতন থাকি না। আমার ছোট মেয়ের ক্ষেত্রে দেখেছিলাম মুরগি কাটা হচ্ছে দেখে ও পুলিশকে সেটা বন্ধ করার জন্য একটা চিঠি লিখেছিল।
আমাদের প্রকৃতির পশু পাখিদের একমাত্র শিশুরাই নিজেদের আপন বলে ভাবে। বারান্দায় একটা পাখি দেখলে খেতে দিতে চায় , ছোট কুকুর ছানা বেড়াল ছানা দেখলে আদর করতে যায়। সেটা ওদের শেখাতে হয় না।। যেমন একবার একটি কর্মশালায় একটি মেয়ে তিনটে শব্দ নিয়ে গল্পে লিখেছিল, 'পাখিদের খেলার মাঠ হল আকাশ।' এভাবে ওরাই ভাবতে পারে।
মালবিকা- তাহলে এভাবেই বাচ্চাদের কাছ থেকে তুমিও অনেক শব্দ চয়ন করো। অনেক ভাবনা পেয়ে যাও। এরকম প্রাপ্তি যে তোমার ঘটে ,আমি জানি না এটাই কি তোমার স্বতঃস্ফূর্ত সক্রিয় চলাচল এবং বলা এবং গল্পের পর গল্প বলার উৎসাহ? নিশ্চয়ই তাই। এইতো সেদিন দেখলাম ভিক্টোরিয়ার মাঠে তাদের নিয়ে রেলগাড়ি রেলগাড়ি খেলছো একেবারে অপরিকল্পিত একটি কর্মশালা।
গল্প দিদাকে নিয়ে সাক্ষাৎকার শেষ করলাম । তবে তাঁরই কথার রেশ ধরে বলতে চাই এই যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানে বড়দের সাথে ছোটদের মূলত যে পার্থক্য গল্প দিদার চোখে সেটি হলো বড়রা বড্ড 'ক্যাঁচালে।' ছোটদের এখনো কিছু বললে তারা শোনে । এই যেমন গল্প দিদা মনে করছিলেন যে মা দুর্গাকে এবার বাচ্চারা কি খাওয়াবে? কেক, পেস্ট্রি রোল এবং সত্যিই বাচ্চারা সেরকম মনোবাসনা নিয়ে তার কর্মশালা থেকে ফিরে মা দুর্গার জন্য কেক পেস্ট্রি খাওয়াবে বলে স্থির করে। বাচ্চাদের আঁকা ছবি থেকে চরিত্রগুলোকে টেনে নিয়ে গল্প বলতে থাকেন গল্পদিদা । এভাবেই গল্প বলা চলুক আমাদের ভাঙ্গা পরিবার বা ছোট পরিবার গুলিতে।কারণ পরিবারে হয় বাচ্চাদের খুব ছাড় দেওয়া হয়, অথবা অতিরিক্ত নজর দেওয়া হয়। এরকম অবস্থায় গল্প দিদার গল্প ছোট ছেলে মেয়েদের মস্তিষ্ককে শুশ্রূষা দেওয়ার অন্যতম উপায়। গল্পদিদা ভালো থেকো।