আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালন : স্মরণ ও বর্তমান জটিলতা

“We Write. We Rise” – Voices from Within by Our Writers

...

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালন : স্মরণ ও বর্তমান জটিলতা

পৌষালী ঘোষ

'আমার ভাইয়ের রক্তি রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি' আমরা ভুলতে পারি না। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই দিন গভীর শোকের দিন - শহীদ দিবস। আর সমস্ত বাংলাভাষী মানুষের কাছে এ দিন একই সঙ্গে শোকের - শ্রদ্ধার - সম্মান ও স্বীকৃতিরও বটে।

ভাষার জন্য আন্দোলনের ইতিহাস অবশ্য আরো বিস্তৃত - আরো পুরোনো।

বাংলা ভাষার জন্য প্রথম আন্দোলন হয় মানভূম জেলায়, ১৯১২ সালে। হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে, পুরুলিয়া জেলা ( পুরুলিয়া তখন ছিল বিহারের অন্তর্ভুক্ত) র মানুষ আন্দোলন করেন।

তারপর ১৯৫২- র আন্দোলন। তারপর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা আন্দোলন হয়, বাংলাভাষাকে কেন্দ্র করেই, দিনটি ১৯ মে, ১৯৬১ সাল। আাসামের শিলচর জেলার বরাক উপত্যকায়, এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন কমলা ভট্টাচার্য নামের এক কিশোরীসহ ১১ জন মানুষ।

এ তো গেল বাংলা ভাষার জন্য বৃহৎ লড়াইয়ের খবর। এছাড়াও প্রতিদিন কত টুকরো অপমানে বিক্ষত হচ্ছে আমারই মাতৃভাষা - কে-ই বা খবর রাখে!

বিশ্বজুড়ে মাতৃভাষার দাবীতে কিন্তু আন্দোলন বারে বারেই হয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা জুড়ে যখনই রাষ্ট্র নিজের সুবিধামত নিজের ভাষা ব্যবহারে বাধ্য করেছে তখনই সেই বাধ্যতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠে প্রতিবাদ করেছে মানুষ। এমনকি প্রাণও দিয়েছে!

কিন্তু প্রশ্ন হল, মানুষ এতটা মরিয়া কেন ভাষার সম্মান রক্ষা করার জন্য? ভাষা তো একটা বিমূর্ত বস্তু। তাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না! তবু তার জন্য মানুষের এই আকুলতা কেন?

আমরা শুনেছি, মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ। মাতৃভাষা মায়ের মত। কিন্তু মা কে তো দেখতে পাই - ছুঁতে পাই। তাহলে..??

চমৎকার একটা উত্তর পেলাম অধ্যাপক আব্দুল কাফির মুখে।

তিনি বলছেন "আমাদের জন্ম তো আকস্মিক। আমরা কে কোথায় জন্মাব, কোন পরিবারে, কোন ধর্মে, কোন ভাষায় - তা আমাদের হাতে নেই। কিন্তু যে ভাষায় আমাদের চৈতন্য নির্মিত হয়, আমরা কীভাবে ভাবব সেটা নির্ণিত হয় সেটাই আমাদের মাতৃভাষা।"

তাই মাতৃভাষার ওপর আঘাত মানে চৈতন্যর ওপর - আত্মসম্মানের ওপর আঘাত। মানুষ তখনই সেই আঘাতকে - অসম্মানকে প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে।

১৯৫২ সালের ঘটনাও তাই। ১৯৪৭ সালে যখন স্বাভাবিক দুটি রাষ্ট্র জন্ম নিল ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত হয়ে তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভাষা নিয়ে একটা চাপান উতর শুরু হয়ে গেল। ইংরাজি আর উর্দু হল রাষ্ট্রীয় ভাষা। স্বাভাবিকভাবেই পূর্বপাকিস্তানের বাংলা ভাষা ভাষী মানুষ তা মেনে নিতে পারল না। তারা সংগঠিত আন্দোলন আরম্ভ করল। পাশাপাশি চলছিল রাজনৈতিক অস্থিরতাও। বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বন্দী রোগী। সেখানেই গোপন মিটিংয়ে ঠিক হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন বৃহত্তর হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

তারই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর গুলি চলে। মৃত্যু হয় সাতজন ছাত্রের - রফিক - জব্বার- শফিউর - সালাম - বরকতসহ আরো দুজন।

১৯৫২ সালের রক্তের বিনিময়ে আমরা কী পেলাম? পেলাম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এই দিনটির স্মরণে রাষ্ট্রপুঞ্জ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলে দিনটিকে চিহ্নিত করে দেন ১৯৯৯ সালে। ২০০০ সাল থেকে ১৮৮টি দেশ দিনটি উদ্ যাপন করছে। আমাদের মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন বিফলে গেল না! আজ স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। তবে তারও আগে আছে '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস। আর আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালনের শুভলগ্নে বাংলাদেশের আকাশে আর এক ক্ষমতা হস্তান্তরের মেঘ। পরিণতি এখনও ভবিষ্যতের গহব্বরে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রজতজয়ন্তী পালনের -- এ তো গৌরবের কথা। কিন্তু এই একটি দিনের গৌরব দিয়ে বাকি ৩৬৪ দিনের অগৌরব আমরা ঢাকা দিতে পারছি কি?

এক কথায় উত্তর, না, পারছি না!

তাহলে উপায়? উপায় বাৎলানোর আগে আমাদের কতকগুলি ভ্রান্ত ধারণা থেকে বার হয়ে আসতে হবে বলে আমার মনে হয়!

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মানে কিন্তু :বাংলা ভাষা' দিবস নয়। সরাসরি বাংলা ভাষা সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের দায় হিসেবে দিনটিকে পালন করলে চলবে না! রবং যারা সরাসরি মাতৃভাষা চর্চা করেন না, তাঁদের দায় আরো খানিকটা বেশি। আমি বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষক হবার সুবাদে জানি, 'বাংলা' সেখানে আর পাঁচটা বিষয় ( সাবজেক্ট) হিসেবে স্বীকৃত হয়। কিন্তু যে বৃহৎ শিক্ষার্থী গোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা তারা কেন তাদের মাতৃভাষাকে কেবল একটি বিষয় হিসেবে পাঠ করবে! আর তাই যদি করে, তাহলে সংকট বাড়বে বই কমবে না!

সেক্ষেত্রে সকল অভিভাবক এবং শিক্ষকদের প্রতি আমার আবেদন - এই বোধটাকে বদলানো। বাংলা নিশ্চিত একটি বিষয় হিসেবে গৃহীত হবে, কিন্তু তারও আগে তার এই স্বীকৃতি কাম্য যে তা আমাদের মাতৃভাষাও।

যে মানুষ নিজেকে সম্মান করে না, সে কি অন্যের থেকে সম্মান দাবী করতে পারে? ! আমার মনে হয়, আমরা বাঙালিরা বোধহয় চিরকাল একটু বেশি উদার হতে গিয়ে নিজেদের অসম্মান ডেকে এনেছি। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, কলকাতায়, আমি কলকাতা এবং তৎসংলগ্ন এলাকার বাইরের কথা বিশেষ বলতে পারবো না, আমার জানা নেই .. বাঙালিরা নিজেদের মধ্যে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বলেন, অবাঙালি হলে তার সঙ্গে ইংরাজি বা হিন্দি ভাষায় কথা বলেন, সেই অবাঙালি মানুষটি হয়তো দিনের পর দিন বাংলা না জেনেই বাংলায় রুটি রুজির ব্যবস্থা করে চলতে পারছেন কেবল বাঙালিদের এই উদারতার কারণে। উদারতা - সহিষ্ণুতা একটি গুণ.. অত্যন্ত প্রসংশনীয় একটি গুণ বলা বাহুল্য ; কিন্তু এর ফল স্বরূপ যখন নিজের মাতৃভাষাটি কোথাও হীনবল হয়ে উঠছে তখন ভেবে দেখতে হবে বৈকি!

উদারতার একটি বিপরীত দিকও আছে.. অতীব আঞ্চলিকতা। অন্য আঞ্চলিক ভাষা গুলিকে নিজে মজা মস্করা। বিশেষ করে দ্রাবিড় গোষ্ঠী র ভাষাগুলি যেহেতু ইন্দো-ইয়োরোপীয় গোষ্ঠী র ভাষা গুলির চেয়ে অনেকটাই আলাদা তাই সেগুলি নিয়ে হাসি ঠাট্টা শোনা যায়। তখনই মনে পড়ে, অন্যকে সম্মান না করলে নিজে সম্মান পাওয়া যায় না।

আমার মনে হয়, আত্মসম্মানবোধ গড়ে তোলা দরকার বাঙালি হিসেবে। হয়তো তাহলেই, একটা একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা একদিনের পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ বা পয়লা বৈশাখের বাইরের দিনগুলোতেও আমরা একই সঙ্গে বাঙালি - ভারতীয় এবং বিশ্বনাগরিক হতে পারব। হ্যাঁ, নিশ্চিত আছে.. অন্য ভাষার আগ্রাসন। তার জন্য আছে উদ্বেগও। কিন্তু অন্যের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর আগে কি উচিত নয় নিজেকে শক্তিশালী করা! কজন বাঙালি নিজে বাঙালি হিসেবে গর্বিত বোধ করে? কজনই বা বাঙালি হয়েও বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার স্পর্ধা দেখাতে পারে। কেউ কেউ তো কোনো ক্ষেত্রে একটু এগিয়ে গেলেই বাঙালি পরিচয় মুছে ফেলতে উদ্যোগী হয়।

তার মানে আমাদের কিছু অস্ত্র চাই। আত্মসম্মান বাড়ানোর অস্ত্র। নিজের ভালোবাসাকে নিয়ে অন্যের সঙ্গে লড়ে যাওয়ার অস্ত্র। আমাকে কেউ যদি বলেন, " বাংলা পড়ে - পড়িয়ে চর্চা করে কী লাভ? " তার উত্তর যদি আমার কাছে না থাকে, আমি দুর্বল হয়ে পড়ব - উত্তর দিতে পারব না। আর ভিতরে ভিতরে আমরাও বিশ্বাস করতে আরম্ভ করব " বাংলা পড়ে, বাংলায় পড়ে, কোনো লাভ নেই"।

প্রথম লাভ হল, ঐ যে বললাম, চৈতন্যের নির্মাণ। ভাবনার বিকাশ! আমি যদি যে ভাষায় আমি ভাবতে শিখেছি সেই ভাষায় আমার বাকি শিক্ষার চর্চা করি, তাহলে সেই শিক্ষা - ভাবনা - পড়াশোনা আমার অন্তরে প্রোথিত হবে - গভীরতা প্রাপ্ত হবে।

আমাদের মনে রাখা ভালো ২০১১ সালের আদমসুমারি অনুযায়ী ভারতের ৮.০৩ % মানুষ বাংলায় কথা বলেন। সংখ্যাটা ভারতবর্ষে ১০ কোটি। বিশ্বে ৩০ কোটি। বিশ্বের সপ্তম ব্যবহৃত ভাষা এটি। ২০১০ এ আমরা ইউনেস্কো থেকে পেয়েছি মধুরতম ভাষার স্বীকৃতি। গতবছর ভারত সরকার বাংলা ভাষাকে দিয়েছে ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি।

আসলে স্বীকৃতি অনিবার্য।

এশিয়ার প্রথম নোবেল পুরস্কার বাংলা ভাষার সাহিত্যিকের হাত ধরে।

অস্কার পুরস্কারের সসম্মান স্বীকৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য।

এছাড়াও আছে বেশ কিছু গৌরবের আখ্যান। যা গল্প হয়েও সত্যি। যার অন্তরে ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত প্রাচ্য দর্শন। সমগ্র পাশ্চাত্য এই দর্শনের শরণ নিয়েছে বারবার। আর প্রায়শঃই সেই শরণ মিলেছে রবীন্দ্রসাহিত্যে। জীবনকে খানিক সুসহ করেছে এর চর্চা।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত ইংল্যান্ডে উইলফ্রেড আওয়েনের মা সুজান আওয়েন চিঠি লিখেছেন কবিকে। জানিয়েছেন যুদ্ধশেষে পুত্রের মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে তিনি ফেরত পেয়েছেন ছেলের নোটবুক। তাতে লেখা আছে " When I go from hence let this be my parting word, / That what I have seen is unsurpassable. " ( "যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই, যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই" / 'গীতাঞ্জলি')।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসী দ্বারা ক্ষতবিক্ষত পোল্যান্ড। ইহুদী বাবা - মা কে হত্যার পর অনাথাশ্রমে শিশুগুলিকে রেখেছে গেস্টাপো বাহিনী। তাদেরও আসন্ন মৃত্যুর জন্য মানসিকভাবে তৈরি করছেন ডাক্তার জানুস কোরচক। তাদের শেখাচ্ছেন মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সে অনেকটা রাজার চিঠি পাওয়ার মতোই আনন্দের। ছুটি পাওয়ার মতোই খুশির। তাদের দিয়ে অভিনয় করাচ্ছেন পোলিশ অনুবাদে রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর'।

শেষ ভালোবাসার আখ্যানটি মাত্র চল্লিশ বছর আগের। বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ নাট্য ও চলচ্চিত্র পরিচালক পিটার ব্রুক মহাভারতের নাট্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণকল্পে বিশ্বমন্থনে খুঁজে এনেছেন অভিনেতৃবর্গ। পৃথিবীর নানাপ্রান্তের শিল্পকলায় সাজিয়ে তুলেছেন পট। আর সূচনা সঙ্গীতের জন্য বেছে নিয়েছেন " অন্তরমম বিকশিত করো, অম্তরতর হে। নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে।" ⏹️

25/07/2025