
গঙ্গা নদী থেকে বিভক্ত হুগলী নদী ও ভাগীরথী, স্রোতস্বিনী ভাগীরথীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। আবার কোথাও কোথাও স্থানের মাহাত্ম্য হয়ে উঠেছে তীর্থস্থান। হালিশহর তারই মধ্যে একটি প্রাচীন জনপদ। বাংলার সংস্কৃতি প্রবন অঞ্চল গুলির মধ্যে হালিসহর একটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বা বিশিষ্ট স্থান।
আমি হালিসহরের কথা কিছু 'স্মৃতির পাতা থেকে মনের মনিকোঠায় ভালো লাগাগুলো ছোটবেলার দিনগুলো একটু ফিরে দেখবার ইচ্ছে হোলো তাই এই লেখনী যেন চঞ্চল হয়ে উঠলো।
স্মৃতি যত পুরোনো হয় তা মধুর থেকে মধুরতর হয়ে ওঠে-বিস্মৃতির ভাণ্ডারে। হালিসহর আমার জন্মভূমি। জায়গাটি সর্বদিক থেকে সুবিধাগ্রস্ত না হলেও বেশ নীরব থেকে নিরবিচ্ছিন্ন পরিবেশ, জনমানুষ এর সংখ্যা খুব বেশী ছিলনা তখন সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতো। একে অপরের পরিচিত হলে সৌহার্দ্য বজায় রেখে চলতো। ভোরবেলা থেকে রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন করা থাকতো সরকারি তদারকে। সবুজে ঘেরা অঞ্চল, প্রত্যেকের বাড়ীতেই বাগান, করা থাকতো। আমাদের বাড়ীটি ছিল ছায়ায় ঘেরা, উঠোনের মাঝখানে বড় কাঁঠাল গাছ। বাড়ীর পেছন দিকে খুব বড় আমগাছ লেবু গাছ। কাঁঠাল, আম খুবই সুমিষ্ট। লেবু গাছেও দু'রকম লেবু হোতো। আম গাছের তলায় বসে আমরা পড়াশুনো করতাম। আর উঠোনের চারিদিকে ছিল ফুলের বাগান বাইরে থেকে দেখে নার্সারি মনে হোতো। খেলাধূলো করতে মাঠে যেতে হোতোনা, বাড়ীতেই উঠোনে অনেকটা জায়গা ছিল। শরৎকালে উঠোনে বিছানো শিউলি ফুল যেন আলপনা এঁকে রাখতো। সবমিলিয়ে বড় ইমারতের মতো বাড়ীটি যেন মনে হোতো এক স্বর্গীয় পরিবেশ, বিশেষত জ্যোৎস্নারাতে। বসন্তকালে বকুল ফুলে রাস্তাটি যেন সাদা হয়ে থাকতো। বেলিফুলে গাছ সাদা হয়ে থাকতো। খোলা আকাশ এর সামনে দাঁড়িয়ে যখন চাঁদের আলো উপভোগ করতাম মন যেন অন্য রাজ্যে বিচরন কোরতো। স্মৃতিপটে তুলে রাখা কত গল্প দানা বেঁধে ওঠে। তাই বাড়ীর দেওয়ালে ছবি আঁকতে আঁকতে আমি শিল্পী হয়ে উঠলাম।
শীতকালের দুপুর বেলা সূর্যের আলোতে আমাদের বাগান হয়ে উঠতো রাজকন্যা। বাবা কত রকমের ফুলের চাষ করতেন, ডালিয়া, গোলাপ, পিটুনিয়া, গাঁদা ইত্যাদি।
দুপুরবেলা মা দিদিরা বাড়ির ছাদে নানাধরনের সূচীশিল্প করতেন। আসে পাশের মহিলারাও আসতেন। মা, নানা ডিজাইনের সোয়েটার বুনতেন। মধ্যমনি হয়ে থাকতো একটি সোনার মত চক্চকে পানের ডাবর।"
এখানে বলে রাখি হালিসহরে অনেক পানের বরজ দেখা যেত। অর্থাৎ পানের চাষ হোতো। অদ্ভুত ভাবে পাঠ কাঠি দিয়ে গাঁথা লাইন বরাবর করে রাখা। ওপর টাও এরকম ভাবে ছাউনি দেওয়া। ঘরের মত।
ইস্কুল থেকে বাড়ী ফিরতাম এক প্রকান্ড আমবাগানের মধ্যে দিয়ে। পাহাড়াদার বসে থাকতো। তারপর বারেন্দ্র গলির রাস্তায় উঠতে হোতো। শনিবার দিন হাফ ছুটি হোতো- তখন অনুরোধের আসরে রেডিও তে বিখ্যাত শিল্পীদের গান বাজতো, শুনতে শুনতে "ছায়ায় ঘোমটা মুখে টানি" - আমাদের বাড়ীটিতে এসে পড়তাম।
যখন পুরো স্কুলের দিনে শরৎকালে গঙ্গানদীর তীরে-আকাশে নানা রঙের মেলায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম চুপ করে বসে মেঘের খেলায় কত যে ছবি এঁকেনিতাম তা বলে বোঝানো যাবেনা। কখনও মা দুর্গা গোলাপী রঙের শাড়ী পড়ে আঁচল উড়িয়ে, বাদামী রঙের চুল যেন আন্দোলিত হচ্ছে মাঝে মাঝে সোনালী রোদ্দুরে মনে হোতো কৈলাসপুরী, মহাদেবের জটাজাল বিস্তৃত করে আশীর্ব্বাদ করছেন। দেখতে দেখতে তন্ময় হয়ে যেতাম, আকাশের সঙ্গে নদী যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যেত। দূরে ওই ত্রিবেনী সঙ্গম কে একটু হলেও দেখা যেত। আবার কোনদিন মনে সেই ইচ্ছে হোতো কুমারটুলি তে গিয়ে ঠাকুর গড়ার কাজ দেখতে। অবলীলাক্রমে হাঁ করে ঠাকুর কিভাবে তৈরী করা হচ্ছে, মনের মধ্যে তোলপার হতে থাকতো কতক্ষণে একদম শেষ পর্যন্ত দেখবো রঙ চড়ানো হলে কেমন লাগবে, মা দুর্গাকে সত্যি সত্যি ভাবতাম, আকাশ পাতাল আরও কতোকি ভাবতাম- মনে হোতো ওদের মতো কবে আমি মূর্ত্তি বানাবো। বেরোবার মুখে একপাশে সারি দেওয়া থাকতো মাটির হাঁড়ি। হালিসহরের মাটির হাঁড়ি খুব বিখ্যাত। কেষ্ট পালের মাটির হাড়ি ছিল অতুলনীয়।
হালিসহরের অলিতে গলিতে অনেক শিব মন্দির আছে। বারেন্দ্র গলিতে ঢোকার মুখেই দুটি টেরাকোটার কাজ সমন্বিত প্রাচীন মন্দির আছে। আমাদের পাড়ার যে ঘাটটি অর্থাৎ বৈদ্যপাড়ার ঘাট সেখানেও দুটি শিব মন্দির ছিল নানা ধরনের শিল্প খচিত বিষ্ণুপুরের মন্দির গুলির গায়ে যেমন কাজ করা আছে অবিকল সেইরকম। নৌকোতে করে বালুকারাশি ওখানে এনে রাখা হোতো। উঁচু পাহাড়ের মত ঢেল দিত কিছু মানুষ। অসাধারণ কাজগুলো মন্দিরের গায়ে যে রয়েছে ঢাকা পড়ে যেত। আমরা ওই বালুকারাশির ওপর পাহাড়ে ওঠার মত ছুটে ছুটে খেলতাম। খাসবাড়ীতে শিবের গলি এছাড়া আরও কিছু কিছু জায়গায় নিখুঁত কাজ করা এই মন্দিরগুলোকে বিষ্ণুপুরের মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করলে কিছু ভুল হবেনা। নদীর ঘাটে নামার আগেই বড়বড় বট, অশ্বথ গাছ।
আর একটা সুন্দরতম জায়গা হালিসহরের ক্রেক পার্ক। এক অভিনব সৌন্দর্য্যের অধিকারী।এই ক্রেকপার্কে দু পাশে পাহাড়ের মত মাটি দিয়ে বাঁধানো কৃষ্ণচূড়া গাছ দিয়ে ঘেরা, নানা গাছের সমষ্টি। লাল হয়ে যখন ফুটতো, গঙ্গার জলের ওপর পরন্ত সূর্যের সময় আকাশ লাল হয়ে মিলে যেত লাল আবীর ছড়ানোর মত অপরূণ সৌন্দর্য্য।
হালিসহরে সংস্কৃত চর্চা হোতো। কোনও একসময়ে হালিসহরের নামছিল কুমারহট্ট। পরবর্তী কালে নাম হয় হালিসহর। এখানে সাধক রামপ্রসাদের মন্দির আছে। হালিসহর একটি দেবত্ব স্থান। সাধক রামপ্রসাদ নিজ হাতে মূর্ত্তি তৈরী করতেন এবং পূজো করতেন। কালীমূর্তি তৈরী করে সঙ্গীত রচনা করতেন। অপূর্ব সঙ্গীতের সমাহার বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে বিশেষতঃ পান্নালাল ভট্টাচার্য্যের কন্ঠে খুবই জনপ্রিয় ছিল এখনও আছে। এই মন্দিরটিতে মূর্ত্তি খুব জাগ্ৰত। এখানে পঞ্চবটী তলা, সেই পুকুর শিব মন্দির সব মিলিয়ে এক শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ। নাটমন্দিরটি সামনেই। কালী পূজোর দিনে খুব ভালো অনুষ্ঠান হোতো। এখানে যাঁরা সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতবিদ সেই ব্যাক্তিরা চন্ডীপাঠ করতেন। বিশিষ্ট শিল্পীরা রামপ্রসাদী সঙ্গীত পরিবেশন করতেন।ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, জপমালা ঘোষ, আলপনা বন্দোপাধ্যায়, গোবিন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায় এরা গানগাইতেন। সারা রাত ধরে-এই অনুষ্ঠান চলতো। খুব ছোটবেলা হলেও আমার, ওই সুন্দর ভাবঘন পরিবেশ খুব ভালো লাগতো।
ভোর হয়ে আসতো মায়ের সাথে বসে পূজো দেখতে দেখতে
ঘুম এসে যেত। হালিসহরের অলিতে গলিতে মহাপুরুষদের জীবনী অবলম্বনে সুন্দর সুন্দর গল্প নিয়ে কালী পূজোর প্যান্ডেল গুলিতে মূর্ত্তি তৈরী হোতো। সাধক দের জীবনের ঘটনাবলী কে পূজামণ্ডপে আলাদা মাত্রা দিতো। কালী মূর্ত্তিগুলি খুব ছোট কিন্তু আকর্ষনীয়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে মেঘের যে রঙ মায়ের মূর্ত্তির রঙ ছিল তদনুরূপ। শোলার গয়নায় সুসজ্জিত মা কে অপরূপ সুন্দরী লাগতো। ২৬ শে জানুয়ারী এই দিনে রামপ্রসাদের অন্নকূট এর উৎসব কে ঘিরে মেলা বসে। এই অন্নকূট একটি দর্শনীয় যা আভিজাত্যের ধারা বহন করে। প্রচুর ভক্তসমাগম হয় এখানে। মেলাতে অনেক রকম জিনিস পাওয়া যেতো, তবে এখন হয়তো আরও তার প্রাচুর্য্য বেড়েছে। তবে ছোটবেলার ভালো লাগা গুলো ভুলতে পারিনা। সেই ভালোর তখন বাসা ছিল কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি, পরিবেশে ভালোর বাসা খুঁজে পাইনা। সেদিন (২৬শে জানুয়ারী) আমাদের স্কুলে যেতে হোতো। খুব কাছেই ছিল রামপ্রসাদের ভিটে, স্কুলের অনুষ্ঠান শেষে আমরা মন্দিরে যেতাম অন্নকূট দেখতে।
এখানে আরও মন্দির আছে। স্বামী নিগমানন্দের আশ্রম। চৈতন্য ডোবা, রানী রাসমনির মন্দির। রানী রাসমনি ছিলেন হালিসহরের কন্যা।
হালিসহর আধ্যাত্মিকতার ছায়ায় বেষ্টিত ছিল।
হালিসহরে পথ, ঘাট, এক অবর্ণনীয় নিরবতায় আচ্ছাদিত ছিল।
খেয়া পারাপারের ঘাটটির নাম ডানলপ ঘাট। আরও অনেক কথা স্মৃতির পাতা থেকে ভিড় করে আসে কিন্তু আজ এখানেই বলি কখন যেন ছোটবেলা থেকে মেয়েবেলা তে চলে এলাম হালিসহর কে বিদায় জানিয়ে কলকাতায় পাড়ি দিলাম। কিন্তু, যেখানে গাছপালা প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ কোরতো গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের দিদিমনি (মিনতি মুখোপাধ্যায়) এবং জ্যেঠু (দিদিমনির বাবা) এক অসাধারন অনুষ্ঠান করতেন। কবিবরণ আমাদের নিয়ে। নাটকের সাজসজ্জা, ভাষ্যে, নৃত্য পরিচালনা, নাটকের স্ক্রীপ্ট তৈরী করে তাতে রূপদান করা, আবৃত্তি, সঞ্চালনা, সব মিলিয়ে ছোটদের তৈরী করে যে সমগ্র অনুষ্ঠানটি উপস্থাপিত করতেন তা অবর্ণনীয়, আজও যেন মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তে আজ বড় অসহায় লাগে। সব যেন ডিজিটালের জগতে যন্ত্রবৎ। তবু তো মন ফিরে যেতে চায় "সেই মুছে যাওয়া দিন গুলি আমায় যে পিছু ডাকে"।
মালা ভট্টাচাৰ্য্য
ডিসেম্বর, ২০২৫