
পূর্ব কলকাতার একটা প্রাচীন অঞ্চল নারকেলডাঙা। এখানে প্রায় শতাধিক বছর আগে কিছু বর্ধিষ্নু বাঙালী পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বঙ্গসমাজ। এরকমই একটি ছোট এলাকা জয়নারায়ন তর্ক পন্চানন লেন। স্বনামধন্য স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি ও তাঁর পরিবার ঘিরে এই বসতি যেন আভিজাত্যে ভরপুর। অনেক জন কৃতি বাঙালির বসবাস এই অন্চলকে আশেপাশের বসতি থেকে একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল।
1925-26 সাল যখন নাকি পৃথিবীর উত্তরতম স্থান উত্তর মেরুতে প্রথম সফল বিমান যাত্রা হল, যখন বিখ্যাত ইউ এস জেনারেল স্ট্রাইক হল 1.7 লক্ষ শ্রমিকের সমাবেশে, যখন নতুন দিল্লী ঘোষিত হল ভারতের রাজধানী হিসেবে - ঠিক সেই সময়কালেই নব্য বাঙালীদের জোট বাধার প্রবনতা কলকাতার নতুন ধারা হিসেবে দেখা যেতে লাগল। তখন তো সুযোগ্য ,শিক্ষিত , আধুনিক মনস্ক বাঙালীদের স্বর্নযুগ।
এ হেনকালে এই নারকেলডাঙার বোসপাড়ায় শুরু হয় কালীপুজোর আয়োজন। তখন ষষ্ঠীতলার দুর্গাপুজো ও স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি বাড়ির ও ভট্টাচার্য বাড়ির জগদ্ধাত্রী পূজো হত এই এলাকায়। কালীপুজো করতে কেউ খুব একটা সাহস পেতেন না। গৃহীরা তো নয়ই।
তিনটে বোসবাড়ি, একটা মিত্তির বাড়ি আর একটা ভট্চায বাড়ি এই নিয়ে শুরু 1925 থেকে। আমার দাদু শ্রী আশুতোষ মিত্র এই পূজোর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পাড়ার অন্যান্য গন্যমান্য ব্যাক্তিত্ব দের সঙ্গে। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ITC
company তে বড়বাবু ছিলেন। তা যাই হোক, সবাই মিলে ঠিক করলেন যে তাঁরা যেমন একান্নবর্তী পরিবারের মতোই মিলেমিশে আছেন তেমন ভাবেই কালীপুজো করবেন। তবে ঠিক হলো একেবারে কৃষ্ণবর্ণা না করে মূর্তি হবে দূর্বাদলশ্যাম। আর মুখের আদল বেলুড় মঠের কালীর মতো। শুরু হলো বাৎসরিক মহোৎসব।
প্রতি বছর সব বাড়ির আত্মীয়স্বজনদের উপস্থিতিতে পাড়া গমগম করতো।ধীরে ধীরে কালীপুজোটা সবার বাড়ির পূজো হয়ে উঠল। আমিও এটাই অনুভব করে এসেছি ছোট থেকে। ছোট থেকে বড় সবার হৃদয়ে এই দিনের জন্য সারাবছর অপেক্ষা থাকত। নির্দিষ্ট দিনে বেদী তৈরী করা, চৌকি ধোয়া হত। কারন তাতে আলপনা আঁকা হবে। রাতে হিম পড়ত বলে সারা পাড়া জুড়ে ওপরে চাঁদোয়া টাঙানো হতো। ওটা আমাদের নিজস্ব ছিল । সেই চাঁদোয়া কেচে রোদে দেওয়া হতো। সব বাড়ির কাজ নির্দিষ্ট করা ছিল। কারোর বাড়ির বৈঠক খানায় পূজোর যোগাড় চলত,কারোর বাড়ি পড়ত ভোগ রান্নার দায়িত্ব, কারোর বাড়ির ভার ছিল যাবতীয় পূজোর বাসন ঝাঁ ঝকঝকে করার! আমার ঠাকুমা কালীপুজোর যাবতীয় সলতে তৈরী করতে বসতেন দুপুরের পর।ঢাকি আসত দুইজন। প্রতিবেলায় এক একবাড়িতে তাঁদের খাওয়ার আয়োজন। আমাদের পালা পড়ত কালীপুজোর রাতে। বাবা নিজে বসে থেকে খাওয়ার তদারকি করতেন। দাদুর মতো।
এ পূজোয় কোন চাঁদার প্রচলন নেই। স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে সারাবছর ধরে সবাই একটু করে টাকা দেবার চল। নিয়ম
ছিল প্রতি বাড়ির আর্নিং মেম্বার রা টাকা দেবেন। আমার মা প্রভূত তৃপ্তি বোধ করতেন এই চাঁদা দেওয়াতে কারন তখনকার দিনে পাড়ায় মাত্র দুজন বধূমাতা চাকুরীরতা ছিলেন। মা শিক্ষকতা করতেন আর শেষ বছর পর্যন্ত পেনশনের টাকাতেও এই সাহায্য করে গেছেন।
আরেকটা বিশেষত্ব হল এ পাড়ায় পূজোর সব কিছু নিজেরাই করতেন। প্যান্ডেল করা , তার সাজসজ্জা যা হতো মা কাকীমা দের কাপড়ে কুঁচি মেরে, কুমোরটুলি থেকে ঠাকুর আনা সবই। দুর্গাপুজো থেকে কালীপুজোর আগের প্রতিটি ছুটির দিন আমরা অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম কখন সকাল ন'টা বাজবে! বইখাতা গুটিয়ে সটান বাইরে কতক্ষনে যাব।
মনে আছে পূজোর পঞ্চাশ বছরে দাদু তেরঙ্গা চাইনিজ লন্ঠন কিনে এনে সারা পাড়া সাজিয়েছিলেন। পরের প্রজন্ম গুলোতেও এই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।
প্রায় প্রতি বছর দাদু নিজের হাতে একটা বিরাট ফানুস তৈরী করতেন।ঘরের মেঝেতে ফেলে ঘুড়ির রঙীন কাগজ কাটিং করে জোড়া হত। শেষের দিকে আমি ছিলাম হেল্পার।ফানুস ছাড়া হতো বিকেলে, ঠিক কালীকীর্তন বসার আগে।
কালীপুজোর সঙ্গে সঙ্গে কালীকীর্তনের একটি দলও তৈরী হয়। তাতে বোসপাড়ার এবং ষষ্ঠীতলার অনেক গন্যমান্য ব্যাক্তিত্ব রা ছিলেন। গুরুদাস ইনস্টিটিউটের দোতলার হলঘরে দুর্গাপুজোর আগে থেকেই প্রতি সন্ধ্যায় রেওয়াজ চলত। সমস্ত এলাকা ঐ সম্মিলিত উদাত্ত কন্ঠের কালীনামে গমগম করতো।আন্দুলের রাজবাড়ির থেকে সংগৃহীত গানগুলি কালীপুজোর সন্ধ্যায় গাওয়া হতো। প্রায় কুড়ি পঁচিশ
জনের এই দলের সবাই গেরুয়া জোব্বা পরে, জটাধারী হয়ে , হাতে সিঁদুর লেপা চকচকে ত্রিশূল নিয়ে আর কপালে ইয়াব্বড় টিকা পরে গান শুরু করতেন। সারা পাড়া সম্মোহিত হয়ে থাকত। শেষ হতো 'আর কেন মন এ সংসারে' কীর্তন দিয়ে যাতে সবাই অংশ নিতেন। একটা অনাবিল আনন্দলাভের আশায় সারাবছর , ছোট থেকে বড় সবাই অপেক্ষা করতেন।
কীর্তন গানের পর অথবা কোন কোন সময় একই সঙ্গে পূজো শুরু হতো। ভট্টাচার্য ঠাকুরমশাই , যিনি বোসপাড়ার সব বাড়ির কূলপুরোহিতও ছিলেন, শুনেছি তাঁর পূজো অনবদ্য ছিল। তারপর পূজোর ভার পড়ল তাঁর ছেলে, আমাদের সবার ফুল জ্যেঠুর ওপর। কি অন্তর ঢালা নিবেদন সেই পূজার্চ্চনায়। মন্ত্রোচ্চারনে গায়ে কাঁটা দিত। আরতির সময় তাঁর অশ্রুধারায় মা'কে বরন কোনদিন ও ভোলা যায় না। একেএকে ফল বলিদান, আরতি,অঞ্জলি, হোমের মাধ্যমে পূজো শেষ হতো। বলি ও ছিল দেখার মতো একটি গুরুগম্ভীর পর্ব।তারপরই প্রতিবছর বুকচিরে রক্ত দিতেন আমাদের এক কাকা। এ দৃশ্যপট আমার ছোটবেলার এক রোমহর্ষক মুহূর্ত!
আমার বাবা শ্রী গৌরমোহন মিত্রও পূজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিলেন। বিসর্জনের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা বাবাই করতেন। পুলিশ পারমিশন থেকে লরির ব্যবস্থা বাবুঘাটে ঠিকমত প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফেরা এসবই বাবা করতেন।পরবর্তী কালে বিসর্জনের রাতে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া শুরু হয়। তাতেও বাবার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
এখনও চলছে এই এই পূজো তার নিজস্ব প্রবাহে। কত মানুষ এলো গেল, কত শূন্যতা বাড়ীগুলোতে তবু বদলে যাওয়া
হাতগুলো এখনও একে ধরে রাখতে চায় এটিই বড় আনন্দের। এই পড়তি বাঙালীয়ানার যুগে আমাদের কিছু তো ধরে রাখা দরকার। পরবর্তী প্রজন্মের শিকড় টানটান হয়ে থাকুক এসব মিলনের মাধ্যমে।
'বহে নিরন্তর আনন্দধারা'।
রঞ্জনা ঘোষ
ডিসেম্বর , 2025