
সুইসাইড পয়েন্ট! পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে গেছে গভীরতম খাদ ! কোথায় থেমেছে এই শূন্যতা দেখা যায় না।
গত কয়েকদিন পাহাড়ের সর্পিল পথে ঘুরে বেরিয়েছে সে। সুইসাইড পয়েন্টের সামনে এসে দাঁড়াল সে। খোঁজ খোঁজ… কীসের সন্ধান যেন নিজেও তার স্বরূপ বুঝতে পারছে না!
হিমালয়ের এদিককটার পাহাড়ের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করেছে সে। এইদিকে খানিকটা খয়েরি রঙের ধূসর পাহাড়৷ তার গায়ে আঁকিবুঁকিগুলো খুবই আকর্ষণীয়। তার অধীত বিদ্যা ছিল ভুগোল। সেই বিদ্যাই সচেতনভাবে বলে দিল যে, যেহেতু রকি পাহাড় তাই বাতাসের প্রবল ঘর্ষণে এই অঙ্কন শিল্প প্রকৃতিই এঁকে দিয়েছে! এখানে বাতাসের শব্দ খুব স্পষ্ট, যেন কথা বলছে! সেইদিকেই মন চলে গেছে। সম্প্রতি আবিস্কার হয়েছে, গাছেরা কাছাকাছি থাকা গাছেদের সঙ্গে রীতিমতো কথা বলে। তারা কেউ বিপদ সঙ্কেত পেলে, তেষ্টা পেলেও আরেকজনকে বার্তা বিনিময় করে। এখন তার মনে হল, এখানে এই শান্ত নির্জনতার মধ্যে কী কথা বলে তারা? ঈশ্বরের কথা? যে পরিমাণে তাদের সংহার হচ্ছে সেই আশঙ্কার কথা? হারিয়ে য়াবার ভয়ের কথা নাকি শুধুই ভালোবসার গল্প? লোকজনের ভীড় বাড়তেই সে জায়গাটা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। তার গাড়ির চালককে ফোন করে জানিয়ে দিল কোথায় আসতে হবে। মনের মধ্যে তখন একটাই প্রশ্ন, কেন কোনো কোনো মানুষ মৃত্যু চায়? সুইসাইড পয়েন্টে এসে..!!! হাঁটছে সে। পথের দু'পাশে রকমারি ফুল ফুটে আছে ঝোপের মধ্যে। গন্ধহীন ফুল সব কিন্তু রঙের অপূর্ব বাহার। একটা ফুলের গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে বলে ফেলল, দীপ! তুই?? ভালো থাকিস বাবা। এইভাবেই তোর সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে কোথাও না কোথাও!
কয়েক পা হাঁটতেই ঠিক নদীর পাড় ঘেঁষে কাঠের তৈরি হোটেলটাতে চোখ পড়তেই ঢুকে পড়েছে সে। মিষ্টি বউটি হেসে আপ্যায়ন করল, ক্যা লেঙ্গে ম্যাম? ভেজ মোমো, রাইস চিকেন, আন্ডাকারি..?
--মোমো এক প্লেট। ঔর কফি মিলেগা?
বাসপা নদী পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে। এখানে স্রোত কম। কলকল করে কথা বলে যেন জল! পাহাড়ের গায়ে নির্জনতা আবিল হয়ে বিশ্রামরত! শব্দ বলতে একটানা ঝিরঝির আর কলকল কলকল শব্দ! আরও ভালো লাগছে তার দোকানে সে একাই খরিদ্দার। এই গভীর নৈশব্দের মধ্যে যখন সে প্রায় অবলুপ্ত-চেতন তখনই হইহই করে একটা গোটা শহর ঢুকে পড়ল দোকানে।
“আরেএএএ চিত্রাঙ্গদা!! তুইইইইই…! ভুল না হলে…?”
কাঠের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে নদীর বহমানতার সঙ্গে ভেসে চলেছিল সে এতক্ষণ। আচমকা চিৎকারে, আওয়াজে চমকে উঠে ফিরতেই অবাক। 'ধরিত্রী না? হ্যাঁ স্কুলের সহপাঠী..! হ্যাঁ তো!
ধরিত্রী তার ইস্কুলের বন্ধু। সঙ্গে মেঘমালাকেও দেখে অবাক। সহপাঠী ছিল। বাকিদের চিনতে পারল না সে।
--তোরা!!! ধরিত্রী তুই!!! মেঘমালা তো? , চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে সে উত্তেজনায়।
ফেসবুকেই যোগাযোগ দীর্ঘ বছর পর ইস্কুলের সহপাঠীদের সঙ্গে। তারপর ফোনে টুকটাক কথা। কিন্তু দেখা হয়নি। খুবই উত্তেজিত সে। ধরিত্রী মেঘমালাও উত্তেজিত। মেঘমালা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরেছে তাকে, ওহ ডিয়ার! কত্তদিন পরে! কী সুন্দর আছিস রে তুই এখনও! পুরো হিরোইন লাগছে! তারপর? তুই একা ? সঙ্গে ..?
ধরিত্রীর মুখে খুশির আভাস, জড়িয়ে ধরেছে সেও, বলল,কী ভালো লাগছে তোকে দেখে রে! কত বছর পর বল তো? ঠিকঠাক হিসেব মত বত্রিশ বছর। সেই আমাদের তখন কারোর পনেরো কারোর ষোলো! ধরিত্রী বলল, ওরা আমাদের বন্ধু। আয় আলাপ করিয়ে দিই। আমাদের একটা গার্লস গ্যাঙ আছে। হি হি.. পুরো এক ডজনের গ্যাঙ। এই ট্রিপে আমরা আটজন এসেছি৷
--ব্বাহ!
--তুই একা? আর কাওকে দেখছি না! ' মেঘমালা জিজ্ঞেস করল।
এই প্রশ্নটা শুনতে শুনতে এখন কমন প্রশ্ন আসার মত হয়ে গেছে তার কাছে। তাই বিন্দুমাত্র দেরি না করে বলল, ঠিক ধরেছিস রে৷ একা।
মেঘমালা বলল, ওহ! কী সাহস তোর! বাবা!
--আমি আর আমার বর ; হ্যাঁ মানে যখন বেঁচে ছিল আমরা স্ব অভিভাবক ছিলাম রে। পরামর্শ নিতাম কিন্তু ডিসিশন নিজেরাই নিতাম। ও ঘুরতে পছন্দ করত না তেমন আর আমি বোহেমিয়ান! তখন থেকেই একা ঘোরার অভ্যাস। এখন তো পুত্র বর কেউই নেই!
--হ্যাঁ খুব স্যাড,রে! তবু তুই তো কাটিয়ে উঠেছিস, এটা দেখে ভালো লাগছে। আমি হলে যে কীভাবে সামলাতাম…! জানি না আদৌ সামলাতেই পারতাম কিনা ! ধরিত্রী বলল। 'কিন্তু আত্মীয়স্বজন?
মৃদু হাসল সে, কে আত্মীয় আর কে স্বজন বুঝতেই তো পথে বেরিয়ে পড়েছি রে! নিজের মুখোমুখি বসে নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় তো আমরা পাই না! তাই না? ... ছাড়, বল তোদের কথা। কতদিনের ট্যুর? নিজেরাই না ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে?
দু'জনেই যেন এমন কথা শোনেনি আগে। পরস্পর দৃষ্টি বিনিময় করল। মেঘমালা বলল, কিন্তু ইন-ল'জ রা কিছু..?
--দীপঙ্কর যখন খুব অসুস্থ ফুসফুসের সংক্রমণে তখন পাশেই ওদের অন্য বাড়িতে ছিল। আইসোলেশনে। ওর বাঁচার আশা ছিল কম। সেই অবস্থাতেই আত্মীয়স্বজন আরও ভালভাবে চিনেছি। বন্ধুবান্ধব চিনেছি। ভাইয়ের পছন্দ, ভালো থাকার চেয়ে ওই তোদের আত্মীয় ও স্বজনদের ইগো বড় হয়ে উঠেছিল। ওরা অনেক অনেক টাকা খরচ করেছিল ওর জন্য! কিন্তু মানসিকভাবে দীপঙ্কর মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল! ছাড়…!
'আমরা তোর টেবিলে বসি?' বলতে বলতে দু’জনেই বসে পড়ল।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে পড়েছে দলটা। আলাপ পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ধরিত্রী সকলের সঙ্গে। মধুমিতা নামের মহিলাটি অন্য টেবিল থেকে আচমকাই জিজ্ঞেস করল, একটা প্রশ্ন করতে পারি আপনাকে?
-- কারোর সঙ্গে সিমিলিয়ারিটি পাচ্ছেন?
ইতস্তত মধুমিতা, বলল, না, আপনার কি একটা কবিতা চিত্রাঙ্কন বলে বই আছে?
--হ্যাঁ। আপনি দেখেছেন বইটা? ওই একটাই!
ধরিত্রী কিছু বলতে যাওয়ার আগেই মধুমিতা বলল, তাহলে ঠিকই ধরেছি, বলুন! আপনি তো ফেমাস! আমার হাবি কিনে এনেছিল বইটা দিল্লি বুক ফেয়ার থেকে। রন তো আপনার রূপে গুণে ফিদাই! বইয়ের ব্লার্বে আপনার পিক..!
ধরিত্রী আর মেঘমালা অবাক! দু’জনেই একসঙ্গে বলে উঠল, সে কী রে! এই খবরটা তো জানতাম না! বাব্বা! তুই তো সেলিব্রিটি!
গ্রুপের অন্য মেয়েরাও যে যার জায়গায় বসে শুনছে আর বিস্ময় নিয়ে দেখছে তাকে।
এসব প্রসঙ্গ এলেই বিব্রত বোধ করে সে। তাই বলল, ছাড় না ওসব। বন্ধুদের মধ্যে এসব আবার কী? ওই কিছু কবিতা লিখেছিলাম, ছবিও এঁকেছিলাম। প্রকাশক কনট্যাক্ট করল, ব্যস..! কাজের চাপে আর হয়নি। আচ্ছা এবার তোদের কথা বল।
ধরিত্রী বলল, আমি তো জানিসই এম এ করেই বিয়ে… সম্বন্ধ করে! ও তো মেডিকাতে আছে, জানিস তো। বলেছি তো ফোনে। আমার আর চাকরি করতে ইচ্ছে করল না, বরের ও ইচ্ছে ছিল না। সোম বলল, কত টাকা পকেট মানি দরকার তোমার, বলো? আমি তোমার অ্যাকাউন্টে দিয়ে দেব। হি হি হি.. কে খাটতে বেরোয় বল? সুইমিং করছি, পার্লারে যাচ্ছি ইয়োগা ক্লাস জয়েন করেছি। এই যে গার্লস গ্যাঙ দেখছিস, আমরা কেউই জব করি না। অনীতা শুধু অনলাইনে কেকের বিজনেস করে। নিজেই বেক করে। আর ওই যে সুচরিতা, ও খুব ভালো নাচত একসময়। বর অ্যালাও করল না। এখন এত বছর পর বাড়িতে একটা ডান্স স্কুল খুলেছে! তবে ও নাচে না।.. হে হে.. বরের হোটেলের মালকিন আমরা।
ধরিত্রীর কথা শুনে সবাই হেসে হেসে সম্মতি দিচ্ছে তখন।
মেঘমালা বলল, আমারও সেম কেস। এতদিন বর ছাড়ত না, ভাবত তো যে যদি বউ অন্য কারোর সাথে লাইন মারে! হে হে.. জব করতেও দিল না। আমারও ইচ্ছা করেনি। দেখ ভাই না চাইতেই যদি তুই সব পেয়ে যাস তাহলে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কে কাজ করতে বেরোয়? চাকরি করলেই কি সবাই স্বাধীন না সেই সম্মান পায়?
--কে সম্মান করবে সেই ভেবে কি কেউ জব করে ? ওটা আইডেন্টিটি।
মধুমিতা বলল, আপনি তো সেলিব্রিটি!
সে কথার উত্তর না দিয়ে সে বলল, নদীটার নাম জানেন? জানিস তোরা?
--ন্নাহ। এখানে কত নদী! অত নাম জানব কী করে?' আমরা এই গার্লস গ্যাঙ বছরে দু’বার এনজয় করতে বেরিয়ে পড়ি। ব্যস।
খাবারের অর্ডার দিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে নদীকে দেখে ধরিত্রী বলল, বিউটিফুল প্লেস!.. হ্যাঁ রে শ্বশুরবাড়ির প্রপার্টি পেয়েছিস?
--বাসপা। এখানকার প্রধান নদী।..আর সুলটেজ প্রধান নদী। ও, হ্যাঁ, না শ্বশুরবাড়িতে থাকি না। আই ওয়াজ ফিস আউট অব ওয়াটার! একটা ভাড়া বাড়িতে থাকি। একলা মানুষ তার বিলাস বর্জিত জীবনে আর কতটুকু লাগে!
-- শ্বশুরবাড়ির প্রপার্টি পেয়েছিস তো?
--দীপের ফ্ল্যাটটা অবভিয়াসলি ওউন করেছি অটোমেটিক সাকসেশর। বিক্রি করে দিয়েছি। সেটাও অবশ্য সম্ভব হলে ওর এক পঁচাত্তর বছর বয়সী দিদি বেঁধেছেদে চুল্লীতে নিয়ে উঠবেন বলেই আশা করেছিলেন.. হে হে হে!
অন্য টেবিল থেকে কেউ বলল, এখানে হুক্কাবার আছে?বেড়াতে এসে হুক্কায় দম না দিলে মজাটাই মাটি।
ধরিত্রী আর মেঘমালা দু’জনই লাফিয়ে উঠেছে, ইয়েস ডিয়ার। বেড়াতে এসে একটু ফান করব না?
অ্যাই তুই জানিস হুক্কাবার আছে কিনা এখানে?
হেসে ফেলেছে সে ধরিত্রীর কথায়,বলল, ন্নাহ রে। মদ সিগারেট হুকা তামাক কিছুই চলে না। ব্যাক ডেটেড।
পুরো গ্যাঙটাই বলে উঠল, বাব্বা! কী বলেন???
পাশের টেবিল থেকে মধুমিতা উঠে এসেছে তাদের টেবিলে। একটা সিগারেট ধরিয়েছে, বলল, আমরা কিন্তু শখে খাই।.. আপনার কথা আমার বর খুব বলছিল যেদিন বইটা কিনে বাড়িতে এল। তখন তো জানতাম না আপনিই ধরিত্রীদের বাল্যবন্ধু! গ্রেট। একজন সেলিব্রিটি আমাদের বন্ধু!
ধরিত্রী উৎসুক, বলল,কী বলছিল রণ দা?
হেসে গড়িয়ে পড়েছে মধুমিতা, ওরেব্বাস! ও যে ক'দিন মেলায় গেছিল দেখেছিল ওনাকে পুরুষ ফ্যানেরা ছেঁকে আছে! তাই বলছিল, ভদ্রমহিলা হেব্বি সেক্সি দেখতে তার ওপর ট্যালেন্টেড !
--আর কিছু বলেননি উনি? ক্যারেক্টর? অবশ্য অত অল্প সময়ে ওটা দেখতে পাননি বোধহয়। আমার ওইটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়, জানি তো! আসলে কী জানেন একটা পর্যায় পর্যন্ত কেউ কেউ অন্যের সাফল্য নিতে পারে! তারপর আর পারা যায় না! আমার সো কলড উচ্চশিক্ষিত ইন ল'জ রাও এর বেশি চিন্তা করতে পারত না!
মধুমিতা অপ্রস্তুত মুখে বলল, আপনি কিছু মনে করলেন?
--উঁহু।এসব তো বহু শোনা কথা।
ধরিত্রী মেঘমালার মুখে ছায়া। আরো এক কাপ কফির অর্ডার দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে সে বলল, তোদের এই গার্লস গ্যাঙদের কি কোনো এন জি ও বা এরকম কিছু আছে?
--না না, জাস্ট মস্তি। আমরা যে মেয়েরাও স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারি বরটর বাদ দিয়ে সেটাই আর কী। একসাথে হয়ে একটু নেশাটেশা করি, ফেসবুক ইনস্টাতে ছবি দিই.. প্রচ্চুর লাইক পাই রে হে হে..!'মেঘমালা উত্তেজিত। এই তো ফিরেই উইমেনস ডে। প্রচুর খাওয়াদাওয়া পার্টি করব।
হেসে ফেলেছে সে, বলেই ফেলল, আমার হার্ড আর্ন মানি, ভাই। বর কিছু রেখে যায়নি! নিজের যেটুকু আছে আর বরের সামান্য । আপনাদের বরেরা বড়লোক!পয়সার অভাব নেই। ওড়াতেও পারেন। এটাও তো একরকম স্বাধীনতা।
ধরিত্রী বলল, হ্যাঁ সেটা তুই ঠিকই বলেছিস। আমাদের একেকটা কিটিতেই যে খরচ হয়, তারপর বরেরা বলে দিয়েছে, সস্তার হোটেলে থাকবে না। অন্তত থ্রি/ ফোর স্টার হোটেল। সিকিওরিটির ব্যাপার আছে তো!... ওয়েট ওয়েট, নির্ঘাৎ অমি ফোন করেছে। ' বলতে বলতে হেসে বলল, যা বলেছি।.. হ্যাঁ বলো।… আরে বাবা, হ্যাঁ ভালো হোটেল পেয়েছি। হ্যাঁ সবাই ঠিক আছি।জাস্ট হোটেলে ঢুকেই বেরিয়েছি। কফি মোমো খাচ্ছি… এখন রাখো রাখো।
খুশি খুশি হাসল ধরিত্রী, বলল, দেখছিস তো কেমন পাগল! সত্যি বলতে কী ও চায় আমি একটু সুন্দর হয়ে সেজেগুজে মর্ডান ড্রেসটেস পরে ফিগারটিগার ঠিক রাখি। পয়সা না চাইতেই একাউন্টে.. আমাদের সবারই প্রায় একই। আমাদের যথেষ্ট স্বাধীনতাও দিয়েছে। শুধু একটু কোথায় যাচ্ছি কে কে সঙ্গে যাচ্ছে, মানে পুরো ট্যুর প্ল্যানটাই বলতে হয়। সেটাতে তো স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয় না!
কফি জুড়িয়ে গেছিল। আরেক কাপ অর্ডার করে সে স্মিত হাসল, ঠিক, ঘুড়ির স্বাধীনতার মত!
--মানে?
--কিছু না রে। স্কুলের দিনগুলো মনে পড়ছে। তুই বলতিস, চাকরি করব। খুব বড় চাকরি!
--হে হে বরের ফাইভ স্টার হোটেলের ম্যানেজার কাম সেক্রেটারি কাম বেড পার্টনার! এত্ত বড় চাকরিই তো করছি.. হি হি..! কিন্তু তোর হাজব্যান্ড?
--তার কোনো কৌতূহল ছিল না। আমি শুধু বলতাম অমুক দিন থেকে অমুক দিন থাকব না। বেরবো। ব্যস।
--ব্যস??? ' ধরিত্রী মেঘমালা ; দু’জনের ভ্রু মাথায় উঠেছে।
--কোথায় কার সঙ্গে কীভাবে যাচ্ছিস কিছুই জিজ্ঞেস করত না? টাকাপয়সা? ধরিত্রী বলল।
--না। আমিও করতাম না কারণ জানতাম ওইটাই ব্যক্তিস্বাধীনতা। ঘুড়ি লাটাইয়ের গল্প নেই!
মেঘমালা বলল, কিন্তু এতে ভালবাসা থাকে?
হাসল সে, কী জানি? মনে তো হত ভালোবাসা ছিল। তবে এই একটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালি। নিজের মুখোমুখি বসতেই তো বেরিয়েছি। মানুষ চিনতে! জীবন চিনতে! সম্পর্ক বুঝতে! প্রকৃতির মুখোমুখি বসে জন্ম মৃত্যুর গল্প জানতে..! ' হাতের মুঠো থেকে একটা মরচে রঙা পাইনের পাতা মেলে ধরে বলল, গাছের জীবনে এই পাতাটা একদিন আদরের ছিল। যখন জন্মেছিল কচি সবুজ ছিল। তারপর সময় এলো, বৃন্তচ্যুত হল। জন্ম ও মৃত্যু। গাছ কাঁদল কিনা জানি না! তবে গাছ হয়ত দেখল ঝরে যাওয়া পাতাটাকে ভালোবেসে কেউ একজন রেখে দিল!
আমার স্বামী আর সন্তান কোথায় কেমন আছে তার উত্তর আজ পেলাম, রে!
আজ উঠি। রাস্তায় আবার দেখা হয়ে যাবে।
কথা বলতে ভুলে গেছে ধরিত্রীরা।
--আসি? জীবন খুঁজতে বেরিয়ে তোদের পেয়েও গেলাম।
--তুই কোথায় উঠেছিস?
সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। চোখের সামনে বরফে ঢাকা পাহাড় শৃঙ্গ! সে দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্ন এলো, চোখের সামনে যা দেখি তা সত্য না আড়ালে থাকা..? ধরিত্রীরা সুখি? তাহলে সে? ঘুড়ি সুতো লাটাই জটিল প্যাঁচ.. জীবন!
হাঁটছে সে। আপাতত অন্তত হাঁটার লক্ষ্যে সে।
কাবেরী রায়চৌধুরী
ডিসেম্বর , 2025